আমি জন্মেছিলাম দুই হাতের কবজি ও পায়ের আঙুল ছাড়া। আমার জন্মের মুহূর্তেই পরিবার বুঝে গিয়েছিল—এই মেয়ের জীবন সহজ হবে না। সমাজের চোখে আমি ছিলাম “বোঝা”—এমন কথাও উঠেছিল আমাকে বাঁচিয়ে রেখে কী হবে। ঠিক তখনই আমার মা দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন,
“দরকার হলে আমি আমার মেয়েকে ভিক্ষা করে মানুষ করব, কিন্তু ওকে মেরে ফেলতে দেব না।”
এই কথাই ছিল আমার জীবনের প্রথম শক্তি। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা—জন্মের ছয় মাসের মাথায় মাকে হারাই।

মা হারানোর পর দাদি আমাকে আগলে রাখেন। বাবার নতুন সংসারে আমি ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ি। দাদির স্নেহেই বড় হওয়া। শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—আমি কি কখনো স্কুলে যেতে পারব? কলম ধরতে পারতাম না, কিন্তু বড় বোনের ধৈর্য আর ভালোবাসায় ধীরে ধীরে লেখা শিখি। সেখান থেকেই আমার পড়াশোনার যাত্রা।

গ্রামের মাদ্রাসায় পড়ার সময় প্রতিবন্ধকতা ছিল নিত্যসঙ্গী। ঘরে আলো নিভিয়ে দেওয়া হতো, জোরে পড়তে পারতাম না—কারণ আমি ‘ডিস্টার্ব’ করতাম। মুখ বুজে সহ্য করেছি, কারণ আমি প্রতিবন্ধী। দাদি অন্যের কাছে সাহায্য চেয়ে আমার পড়াশোনা চালিয়েছেন। নতুন জামা ছিল স্বপ্নের মতো, পুরোনো খাতা–কলমেই চলত দিন। কিছু শিক্ষক বিনা বেতনে পড়িয়েছেন—এই মানুষগুলোর ভালোবাসাই আমাকে টিকিয়ে রেখেছে।

এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকাই যখন জোগাড় হচ্ছিল না, তখন মনে হয়েছিল—সব শেষ। কিন্তু সহায়তায় পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করি। এরপর কলেজে ভর্তি, নতুন শহর, নতুন চাপ—সংগ্রাম আরও বেড়ে যায়। তবুও হাল ছাড়িনি।

এইচএসসি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখা শুরু করি। কোচিংয়ের টাকা ছিল না, পথ জানা ছিল না। ফ্রি কোচিং, মানুষের সাহায্য আর নিজের অদম্য চেষ্টা—সব মিলিয়ে এগোতে থাকি। প্রথমবার ব্যর্থ হই। দাদির চোখের পানি আমাকে আবার দাঁড় করায়। দ্বিতীয়বার প্রস্তুতি নিই।

অবশেষে সেই দিন আসে—বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে চান্স পাই। ভর্তি ফি জোগাড় করাও ছিল আরেক যুদ্ধ, কিন্তু মানুষের সহানুভূতিতে সেই দরজাও খুলে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভয় ছিল—প্রতিবন্ধী আমি, আমাকে কি গ্রহণ করবে সবাই? কিন্তু শিক্ষক ও সহপাঠীদের ভালোবাসায় সে ভয় কেটে যায়। এই পথে মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার আমার পাশে দাঁড়িয়ে প্রথম বৃত্তি ও অমূল্য বিশ্বাস দিয়েছে।

আজ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—
প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়, বাধা হলো হাল ছেড়ে দেওয়া।
আঙুল না থাকলেও স্বপ্ন ধরা যায়—যদি বিশ্বাস আর লড়াই থেমে না যায়।

মিনারা খাতুন
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর