বাবার রিকশায় বোনা স্বপ্ন, বিসিএসে পূর্ণতা

বাবার রিকশায় বোনা স্বপ্ন, বিসিএসে পূর্ণতা

গাইবান্ধা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম। নদীভাঙন আমাদের পরিবারকে শিখিয়েছে—এক মুহূর্তে সব হারানোর কষ্ট কাকে বলে। বাপ–দাদার ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হওয়ার পর আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম অন্য জায়গায়, যেখানে দারিদ্র্যই ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। বাবা কখনো গ্রামে ভ্যান চালাতেন, আবার কখনো ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাতেন। এই অস্থির জীবনে কোনো কিছুই স্থায়ী ছিল না—শুধু অভাব আর অনিশ্চয়তা।

সংসারের হাল ধরতে ছোট বয়সেই মাঠের কাজ, ভ্যান চালানো, টিউশনি—কী না করেছি! অভাব এতটাই তীব্র ছিল যে দুই-তিনবার বাড়ি ছেড়ে কাজের খোঁজে পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছি। আজ ফিরে তাকালে বুঝি, আল্লাহর রহমত না থাকলে হয়তো এই গল্প আর লেখা হতো না।

তবুও পড়াশোনার প্রতি আমার জেদ ছিল অদম্য। সব প্রতিকূলতার মাঝেই এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করি। এরপর ঢাকায় পড়তে আসা—যা ছিল স্বপ্ন ও সংগ্রামের মিশ্রণ। বাবা তখন ঢাকায় রিকশা চালান। রিকশা চালাতে চালাতে তিনি আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর বুয়েট এলাকা ঘুরিয়ে দেখাতেন। বলতেন,

“দেখ বাবা, একদিন তুই এখানেই পড়বি।”

রিকশার পেছনে বসে বাবার চোখে সেই স্বপ্ন দেখেছি—সেই স্বপ্নই আমার ভেতরে গেঁথে যায়।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। আর্থিক সংকটে পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যায়, গ্রামে ফিরে যেতে হয়। আবার নতুন করে লড়াই শুরু করি। বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও, সুযোগ আসে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদে। ভর্তির টাকাও তখন হাতে ছিল না—এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তায় সেই দরজা খুলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর গুলো ছিল চরম কষ্টের,থার্ড ইয়ারের শেষে  খবর পাই মোরাল প্যারেন্টিং পরিবারের। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে এই পরিবার আমার পাশে দাঁড়ায় নির্ভরতার আশ্রয় হয়ে। মায়ানমার প্রবাসী এক মোরাল প্যারেন্টের ধারাবাহিক বৃত্তি ও মানসিক সাহস আমাকে পথে টিকে থাকার শক্তি দিয়েছে।

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে—অসংখ্য ত্যাগ, দোয়া, উপবাস আর নিরলস পরিশ্রমের ফল হিসেবে ৪৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে পড়তে না পারলেও, বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে অন্যভাবে—আমি হয়েছি বিসিএস ক্যাডার।

নদীভাঙনে নিঃস্ব এক পরিবার, রিকশাচালক বাবার চোখে দেখা স্বপ্ন আর এক সংগ্রামী সন্তানের অদম্য বিশ্বাস—এই তিনে মিলেই আমার জীবনের গল্প।

মোঃ মানিক মিয়া

৪৪ তম বিসিএস লাইভস্টক ক্যাডার

সাবেক ছাত্র, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

বিসিএস! বাবার স্বপ্ন পূরণ, সেই বাবাই দেখে যেতে পারলেন না

বিসিএস! বাবার স্বপ্ন পূরণ, সেই বাবাই দেখে যেতে পারলেন না

আমার জীবনের ব্যাকরণ শুরু হয়েছিল এক জীর্ণ কুটিরে, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। বাবা ছিলেন দিনমজুর; কিন্তু তাঁর দুই চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। হাফেজ হওয়ার পর বাবা যখন বলতেন, “আল্লাহ চাইলে তুৃমি অনেক বড় অফিসার হতে পারবা,” তখন থেকেই সেই স্বপ্ন আমার ধমনীতে মিশে যায়।

২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছিল সেই স্বপ্নের প্রথম ধাপ। কিন্তু ২০২০ সালে করোনাকালে পুরো পৃথিবী যখন থমকে গেল, আমার পৃথিবীটাও ওলটপালট হয়ে গেল।আমার একমাত্র আশ্রয় ও শক্তির উৎস—বাবা না-ফেরার দেশে চলে গেলেন।আমার মায়ের চোখের পানি,একদিকে শোকের পাহাড়, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ; আমি তখন দিশেহারা।

সেই ঘোর অন্ধকারের দিনে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল ‘মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার’। তাঁরা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, পিতৃস্নেহে আমাকে নতুন করে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছেন। বিশেষ করে মাহবুব স্যার ও রওশন ম্যামের ভালোবাসা আমাকে শিখিয়েছে—স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে পর্বতের মতো অবিচল থাকতে হয়।

বাবার মৃত্যুর পর বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করা ছিল এক ভয়াবহ পরীক্ষা। টিউশনি আর অভাবের সাথে লড়াই করতে করতে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা চলত। ২০২২ সালে যখন ৪৫তম বিসিএস প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হলাম, আনন্দে দু’চোখ ভিজে উঠেছিল। কিন্তু রিটেন পরীক্ষার ঠিক আগে আমার সামনে হাজির হলো এক নিষ্ঠুর পরীক্ষা—একটি মিথ্যা মামলা। একদিকে আদালতের বারান্দা, অন্যদিকে জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা; অপমান আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম।আমার মা, বড়ভাই তারাও সাহস জুগিয়েছে।নিজেকে বুঝিয়েছি, আমার লড়াইটা শুধু আমার একার নয়, বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নের।

২০২২ সালের শেষে মামলা থেকে মুক্তি পেলেও রিটেন পরীক্ষার ঠিক আগে প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতায় ভেঙে পড়ি। প্রতিটি রাত কাটত তীব্র ব্যথা আর কান্নায়। কিন্তু কলম থামাইনি, কারণ আমি জানতাম—হাল ছেড়ে দেওয়া হবে বাবার স্বপ্নের সাথে বেইমানি।

অবশেষে আল্লাহ আমার শ্রমের প্রতিদান দিয়েছেন। আজ আমি ৪৫তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজন গর্বিত সদস্য। চারপাশে অভিনন্দনের জোয়ার,আমার পরিবার আত্বীয়-স্বজনরা সবাই অনেক খুশি কিন্তু ভিড়ের মাঝে কেবল সেই মানুষটিকেই খুঁজে ফিরি, যার জীর্ণ হাতে আমার আজকের এই সাফল্যের বীজ বোনা ছিল। বাবা নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আজ আমার পরিচয়ে বেঁচে আছে।আমি কৃতজ্ঞ মোরাল প্যারেন্টিং পরিবারের কাছে, যাঁরা আমার দুঃসময়ে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তাঁদের মাঝে আমি আজ আমার বাবার স্নেহ ও ভালোবাসা খুঁজে পাই। এখন আমার লক্ষ্য—আমিও যেন অন্যের স্বপ্ন পূরণে এভাবেই পাশে দাঁড়াতে পারি।

এইচ.এম. ফেরদাউস খান,

শিক্ষা ক্যাডার, ৪৫তম বিসিএস

সাবেক ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

গারো পাহাড়ে জন্ম নেওয়া স্বপ্ন

গারো পাহাড়ে জন্ম নেওয়া স্বপ্ন

গারো পাহাড়ের পাদদেশে, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার ঝুলগাঁও—দূর থেকে দেখলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। পাহাড়, বন আর কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই জনপদে জীবন মানে প্রতিদিনের লড়াই। দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী, শিক্ষার সুযোগ সীমিত, আর আধুনিক জীবনের স্বপ্ন যেন পাহাড়ের ওপারের গল্প। এই বাস্তবতার মধ্যেই আমার জন্ম—আমি সুমন আহমেদ রাহাত।

আমাদের এলাকায় ছেলেরা ছোটবেলা থেকেই গরু চরায়, পাহাড়ে কাঠ কাটে। পড়াশোনা এখানে বিলাসিতা। তবুও আমার জীবনে ব্যতিক্রমী আলো জ্বালিয়েছিলেন আমার বাবা। তিনি বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি, কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস করতেন—শিক্ষাই মানুষের ভাগ্য বদলায়। প্রায়ই বলতেন,

“তুই পড়াশোনা করিস বাবা, একদিন বড় মানুষ হবি।”

এই কথাই আমার জীবনের দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে।

খাড়া পাহাড়ি পথ, ঝড়-বৃষ্টি, কখনো খালি পেট—সব বাধা পেরিয়ে নিয়মিত স্কুলে যেতাম। বন্ধুরা যখন কাজে ব্যস্ত, আমি তখন বই নিয়ে বসে থাকতাম। ২০১৬ সালে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে এইচএসসিতে ভালো ফল করি। আমাদের গ্রামে আমিই প্রথম উচ্চ মাধ্যমিক পাস করি। কেউ উৎসাহ দিয়েছে, কেউ ঠাট্টা করেছে—কিন্তু বাবার বিশ্বাস আমাকে শক্ত রেখেছে।

এই লড়াইয়ের ফলেই আমি ভর্তি হই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। পাহাড় থেকে সমতলে এসে পড়াশোনা করা সহজ ছিল না—নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, অনিশ্চিত অর্থনীতি। বাবা কষ্ট করে আমার পড়াশোনার খরচ চালাতেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে নেমে আসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—বাবার ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসা, দৌড়ঝাঁপ, আর শেষ পর্যন্ত বাবার চলে যাওয়া—সবকিছু যেন মুহূর্তে ভেঙে দেয় আমাদের সংসার।

বাবাকে হারানোর পর ভিটেমাটি ও জমিজমা দখল হয়ে যায়। আমরা আশ্রয় নিই নানার বাড়িতে। সেই দিন থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয়ে ওঠে আরেক যুদ্ধ। টিউশনি করি, অল্প খাবারে দিন কাটাই, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িনি—কারণ জানতাম, হার মানা মানে বাবার স্বপ্নকে হারানো।

এই কঠিন সময়ে মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার আমার পাশে দাঁড়ায় বৃত্তি ও বিশ্বাস নিয়ে। সেই সহায়তা আমাকে আবার দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।

আজ পাহাড়ের পাদদেশে জন্ম নেওয়া এক ছেলের সবচেয়ে বড় সাফল্য—আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।

সুমন আহমেদ রাহাত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

আমি নিজেই এখন মোরাল প্যারেন্ট

আমি নিজেই এখন মোরাল প্যারেন্ট

জীবন সবার জন্য সমান সুযোগ নিয়ে শুরু হয় না। কারো জীবন শুরু হয় আলোর ঝিলিক দিয়ে, আবার কারো জীবনে সেই আলো পৌঁছাতে হয় দীর্ঘ অন্ধকার আর পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে। আমার জীবনের শুরুটা ছিল সেই অন্ধকারের ভেতরেই—যেখানে স্বপ্ন দেখার আগে হিসাব করতে হতো পেটের ক্ষুধা আর আগামী দিনের অনিশ্চয়তার।

আমি একজন ভ্যানচালকের সন্তান। বাবার সেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর প্রতিদিনের সামান্য আয়ের ওপর ভর করেই চলত আমাদের টানাপোড়েনের সংসার। শৈশব থেকেই দেখেছি, নতুন জামার চেয়েও বই কেনা ছিল বিলাসিতার নামান্তর। অভাবের সাথে সেই মিতালি আমাকে অল্প বয়সেই শিখিয়ে দিয়েছিল—স্বপ্ন দেখতে হলেও তার চড়া মূল্য দিতে হয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম, তখন খুশির চেয়েও ভয় আমাকে বেশি জাপ্টে ধরেছিল। গ্রাম থেকে এসে রাজধানীতে টিকে থাকার লড়াই, সেমিস্টার ফি আর থাকা-খাওয়ার চিন্তায় যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই আমার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে ‘মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার’। একদিন ফোনকলের ওপাশ থেকে ড. মাহবুব স্যার যখন বৃত্তির কথা জানালেন, মনে হলো অন্ধকার সমুদ্রে কেউ যেন বাতিঘরের সন্ধান দিল।

দীর্ঘ ছয়টি বছর এই সংগঠন শুধু আমায় আর্থিক সহায়তাই দেয়নি, দিয়েছে একটি বিশাল পরিবার। বিশেষ করে আমার মোরাল প্যারেন্ট আল তামিনী তপু স্যার, যিনি সুদূর প্রবাসে থেকেও ছায়ার মতো আমার পাশে ছিলেন। তাঁর সেই অনুপ্রেরণা আমাকে শুধু একজন বৃত্তিগ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। স্পোকেন ইংলিশ প্রোগ্রামের মেন্টর হওয়া থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়া—প্রতিটি পদক্ষেপে মোরাল প্যারেন্টিং আমাকে শিখিয়েছে নেতৃত্ব দিতে এবং মানুষের পাশে দাঁড়াতে।

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সফলভাবে শেষ করেছি। একসময় যে অনিশ্চয়তা আমাকে তাড়া করত, আজ আমি সেই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছি। বর্তমানে আমি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত আছি। এখন আমার কর্মস্থলের সুবাদে যখন আমাদের কোনো মোরাল প্যারেন্টকে বিমানবন্দরে সেবা দেওয়ার সুযোগ পাই, তখন মনে হয় যেন নিজের পরম আত্মীয়র সেবা করছি। কৃতজ্ঞতার এই ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই।

সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, আমি এখন আর শুধু সাহায্যপ্রার্থী নই; আমি নিজেই একজন মোরাল প্যারেন্ট। অভাবের কারণে আমার যে পথ একদিন রুদ্ধ হতে চলেছিল, আজ অন্য কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবনে সেই পথের বাধা দূর করার দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে নিয়েছি।

কাদের মণ্ডল

গ্রাউন্ডিং ক্রু, BIMAN

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট, ঢাকা

সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কাদামাটি থেকে উঠে এসে ডুয়েটের শিক্ষক

কাদামাটি থেকে উঠে এসে ডুয়েটের শিক্ষক

আমার জীবনের ব্যাকরণ শুরু হয়েছিল গণিতের কঠিন সমীকরণ দিয়ে নয়, বরং অভাবের নিষ্ঠুর হিসাব দিয়ে। আজ আমি ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) গণিত বিভাগের প্রভাষক; কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে ধানের চাতাল, চায়ের দোকান আর মাটি কাটার এক দীর্ঘ ইতিহাস লুকানো আছে।

আমি মোজাম্মেল। আমার বড় হওয়া এক প্রত্যন্ত গ্রামের দিনমজুর পরিবারে। বাবার সামান্য আয়ে যখন দু’বেলা খাবার জোটানোই ছিল অসম্ভব, তখন পড়াশোনা ছিল আমাদের জন্য আকাশের চাঁদ ছোঁয়ার মতো এক বিলাসিতা। শৈশবেই বুঝেছিলাম, টিকে থাকতে হলে হাতের তালুর চামড়া আর মনের জেদ—দুই-ই শক্ত হতে হয়। বইয়ের পাতা ওল্টানোর আগে আমাকে ধানের চাতালে শ্রম দিতে হয়েছে, চায়ের দোকানে কাপ ধুতে হয়েছে, এমনকি নিজের পড়ার খরচ জোগাতে আমি কোদাল হাতে মাটিও কেটেছি।

অন্ধকার ঘরে এক চিলতে প্রদীপ জ্বালাবার মতোই ছিল আমার জেদ। কোনো নামি কোচিং বা গৃহশিক্ষক ছাড়াই কেবল আত্মবিশ্বাসের জোরে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করি। এরপর স্বপ্নের হাতছানি ছিল ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল সাবজেক্ট পাওয়ার পরেও শুধুমাত্র টিউশনির সহজ লভ্যতার চিন্তা করে  আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হই। আমি টিউশনি করে নিজে চলেছি; পরে আমার ছোট বোনকেও এই ভার্সিটিতেই পড়িয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল আমার জন্য আরও এক অগ্নিপরীক্ষা। নিজের মেস ভাড়া, সেমিস্টার ফি আর বাড়িতে টাকা পাঠানোর চাপে যখন আমার স্বপ্নগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম, ঠিক তখনই আমার জীবনে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো আশীর্বাদ হয়ে আসে ‘মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার’।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক উদার শিক্ষক দম্পতি আমার ‘মোরাল প্যারেন্ট’ হিসেবে পাশে দাঁড়ালেন। জীবনের সেই চরম দুর্দিনে তাঁরা কেবল আর্থিক সহায়তাই দেননি, দিয়েছিলেন একজন সত্যিকারের অভিভাবকের মমতা। সেই নিশ্চিন্ত আশ্রয় আমাকে সুযোগ করে দিয়েছিল নিজের পুরোটা মেধা ঢেলে দেওয়ার। ফলাফল হিসেবে স্নাতক পরীক্ষায় ৪৫তম ব্যাচে ২য় স্থান এবং স্নাতকোত্তরে পুরো বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করি। এমনকি ১০ম ও ১১শ জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে (ঢাকা উত্তর রিজিয়ন) যথাক্রমে তৃতীয়  ও প্রথম স্থান অধিকার করেছি।

আজ আমি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাই। কিন্তু সেই পথচলায় আমার মোরাল প্যারেন্টদের ঋণ আমি কোনোদিন ভুলব না। তাঁরা যদি সেদিন আমার হাত না ধরতেন, তবে হয়তো কোনো মাটির কাছে বা ধানের চাতালেই হারিয়ে যেত আমার সব মেধা।

মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি আমার মতো অসংখ্য ‘মোজাম্মেল’দের পুনরায় জন্ম দেওয়ার কারখানা। আপনার একটুখানি সহমর্মিতা হয়তো আরও একটি পরিবারের অন্ধকার দূর করে শিক্ষার মশাল জ্বালাতে পারে। আসুন, মেধাবী এই প্রাণগুলোর পাশে দাঁড়াই, ওদের স্বপ্নকেবাস্তবে রূপ দিই।

মো: মোজাম্মেল হক প্রভাষক, গণিত বিভাগ

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)

সাবেক ছাত্র, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আঙুলহীন হাতে ধরা স্বপ্ন

আঙুলহীন হাতে ধরা স্বপ্ন

আমি জন্মেছিলাম দুই হাতের কবজি ও পায়ের আঙুল ছাড়া। আমার জন্মের মুহূর্তেই পরিবার বুঝে গিয়েছিল—এই মেয়ের জীবন সহজ হবে না। সমাজের চোখে আমি ছিলাম “বোঝা”—এমন কথাও উঠেছিল আমাকে বাঁচিয়ে রেখে কী হবে। ঠিক তখনই আমার মা দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন,
“দরকার হলে আমি আমার মেয়েকে ভিক্ষা করে মানুষ করব, কিন্তু ওকে মেরে ফেলতে দেব না।”
এই কথাই ছিল আমার জীবনের প্রথম শক্তি। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা—জন্মের ছয় মাসের মাথায় মাকে হারাই।

মা হারানোর পর দাদি আমাকে আগলে রাখেন। বাবার নতুন সংসারে আমি ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ি। দাদির স্নেহেই বড় হওয়া। শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—আমি কি কখনো স্কুলে যেতে পারব? কলম ধরতে পারতাম না, কিন্তু বড় বোনের ধৈর্য আর ভালোবাসায় ধীরে ধীরে লেখা শিখি। সেখান থেকেই আমার পড়াশোনার যাত্রা।

গ্রামের মাদ্রাসায় পড়ার সময় প্রতিবন্ধকতা ছিল নিত্যসঙ্গী। ঘরে আলো নিভিয়ে দেওয়া হতো, জোরে পড়তে পারতাম না—কারণ আমি ‘ডিস্টার্ব’ করতাম। মুখ বুজে সহ্য করেছি, কারণ আমি প্রতিবন্ধী। দাদি অন্যের কাছে সাহায্য চেয়ে আমার পড়াশোনা চালিয়েছেন। নতুন জামা ছিল স্বপ্নের মতো, পুরোনো খাতা–কলমেই চলত দিন। কিছু শিক্ষক বিনা বেতনে পড়িয়েছেন—এই মানুষগুলোর ভালোবাসাই আমাকে টিকিয়ে রেখেছে।

এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকাই যখন জোগাড় হচ্ছিল না, তখন মনে হয়েছিল—সব শেষ। কিন্তু সহায়তায় পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করি। এরপর কলেজে ভর্তি, নতুন শহর, নতুন চাপ—সংগ্রাম আরও বেড়ে যায়। তবুও হাল ছাড়িনি।

এইচএসসি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখা শুরু করি। কোচিংয়ের টাকা ছিল না, পথ জানা ছিল না। ফ্রি কোচিং, মানুষের সাহায্য আর নিজের অদম্য চেষ্টা—সব মিলিয়ে এগোতে থাকি। প্রথমবার ব্যর্থ হই। দাদির চোখের পানি আমাকে আবার দাঁড় করায়। দ্বিতীয়বার প্রস্তুতি নিই।

অবশেষে সেই দিন আসে—বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে চান্স পাই। ভর্তি ফি জোগাড় করাও ছিল আরেক যুদ্ধ, কিন্তু মানুষের সহানুভূতিতে সেই দরজাও খুলে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভয় ছিল—প্রতিবন্ধী আমি, আমাকে কি গ্রহণ করবে সবাই? কিন্তু শিক্ষক ও সহপাঠীদের ভালোবাসায় সে ভয় কেটে যায়। এই পথে মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার আমার পাশে দাঁড়িয়ে প্রথম বৃত্তি ও অমূল্য বিশ্বাস দিয়েছে।

আজ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—
প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়, বাধা হলো হাল ছেড়ে দেওয়া।
আঙুল না থাকলেও স্বপ্ন ধরা যায়—যদি বিশ্বাস আর লড়াই থেমে না যায়।

মিনারা খাতুন
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর