by Administrator | Feb 19, 2026 | Project of Moral Parenting
১) আল-কুরআনের মর্মবাণী অনুসন্ধান-
পবিত্র কুরআনের অর্থ জেনে সেই অনুযায়ী জীবন গঠনে মোরাল চিলড্রেনদের উৎসাহিত করতে এই প্রগ্রাম চালু করা হয়েছে। গত বছরের মত এবারও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ্রহী মোরাল চাইল্ডদের জন্য ৫০-৬০ টি (অর্থ সহ উন্নতমানের) কুরআন শরীফ কিনে পাঠানো হচ্ছে। তারা গ্রুপ করে ভাগ করে বিভিন্ন অংশ পড়বে; সুরা ভিত্তিক আলোচনা করবে এবং তা “একসাথে ইফতার” বা অন্য সময়ে অনলাইন-অফলাইনে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। ফাইনালী একদিন সকলে মিলে অনলাইনে একটি প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হবে এবং জয়ীদের পুরস্কৃত করা হবে- এই আয়োজনে আপনি পবিত্র কুরাআন শরীফ কিনে দিতে পারেন।
২) স্বাবলম্বী প্রজেক্ট-
মোরাল চাইল্ডদের পরিবারকে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে “স্বাবলম্বী প্রজেক্ট” পরিচালনা করা হয়। এটি এককালীন সহায়তা প্রদান এবং যাকাতের অন্যতম খাত। গত চার বছরে প্রায় ৫৫০ টি পরিবারকে স্বাবলম্বী ফান্ড প্রদান করা হয়েছে, এর মধ্যে অনেকেই আংশিক এবং কয়েকজন পুরাপুরি স্বাবলম্বী হতে পেরেছে। এত অল্প টাকায় যে একটি পরিবার স্বাবলম্বী হতে পারে তা কল্পনাতীত, কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েরা তা করে দেখিয়েছে; বিভিন্ন সময় Moral Parenting Group এ ওদের সফলতার গল্পগুলো হয়ত আপনাদের চোখে পড়েছে। অর্থ প্রদানের পাশাপাশি সঠিক প্রশিক্ষণ এবং গাইডেন্স প্রদান করার ফলে এই সফলতা এসেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।
এই প্রজেক্টের জন্য এককালীন ১০২০০ (নতুন) বা ৭২০০ (২য় বার) টাকা অনুদান / যাকাত দিতে পারেন। প্রতি প্রজেক্টের জন্য একজন পরামর্শক নিয়োগ করা হয়, এক বছর পর্যন্ত ওরা মোরাল প্যারেন্টকে / দাতাকে ২ মাস পরপর কাজের অগ্রগতি রিপোর্ট পাঠাবে। আপনি এখানে আপনার যাকাতের অর্থ প্রদান করতে পারেন।
৩) একসাথে ইফতার-
মোরাল চিলড্রেনদের পারিবারিক আবহে একদিন ইফতার করার অনুভূতি দিতে প্রতি রমজানের মত এবারও এই কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রায় প্রতিটি ক্যাম্পাসে উক্ত এলাকার মোরাল চাইল্ড, মোরাল প্যারেন্ট ও ক্যাম্পাস গার্ডিয়ান পরিবার সহ একসাথে ইফতার করা হয়।
এটি মোরাল প্যারেন্টিং পরিবারের একটি মিলন মেলা। এখানে ইফতার করার পাশাপাশি আল কুরআনের মর্মবাণী নিয়ে ওরা আলোচনা করা এবং সবার জন্য দোয়া করা হয়।
মোরাল চিলড্রেনদের একদিন একটু ভাল কিছু ইফতারী করাতে আপনিও এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন! কোন মোরাল প্যারেন্ট দেশে অবস্থান করলে আপনার কাছের ভার্সিটিতে ওদের সাথে একদিন ইফতার করতে পারেন, ওরা খুব খুশি হবে।
৪) ঈদ গিফট-
মোরাল প্যারেন্ট তার নিজ মোরাল চাইল্ড কে ঈদের উপহার পাঠাতে পারেন। ঈদের জন্য কাপড় কিনতে বা বাজার করতে টাকা দিতে পারেন। এটা অপশনাল, তবে আমরা অনুরোধ করি সম্ভব হলে বছরে একটা ঈদে নিজ সন্তানের পাশাপাশি মোরাল চাইল্ড কেও কিছু গিফট করা। সবচেয়ে ভাল হয় নিজ মোরাল চাইল্ডের সাথে কথা বলে টাকা / উপহার নিজে সরাসরি পাঠানো। এতে মোরাল চাইল্ডের খোঁজ খবর নেওয়া হল, আপনার কাছ থেকে সরাসরি গিফট পেলে ওরা অনেক খুশি হবে। তবে নিতান্তই যদি সরাসরি দেওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব না হয় তাহলে আমারা হেল্প করতে চেষ্টা করব। আমাদের কাছে খাত উল্লেখ করে টাকা পাঠাতে পারেন বা আমাদের অনুমতি দিলে পর্যাপ্ত ব্যালান্স থাকা সাপেক্ষে আপনার একাউন্ট থেকে কেটে নিতে পারি। আমরা সাধারনত ঈদ গিফট ১০০০ – ৫০০০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে থাকি।
৫) ঈদ সালামী-
যে সকল মোরাল চাইল্ড তাদের মোরাল প্যারেন্টের কাছ থেকে কোন “ঈদ গিফট” পায় না তাদের কে ঈদের কয়েকদিন আগে ঈদ সালামী (১০০০ টাকা) দেওয়া হয়। গত বছর এমন প্রায় ২০০ জনকে ঈদ সালামী দিয়েছিলাম। এবার আরও বেশী মানুষকে আর একটু বেশী পরিমানে টাকা দিতে চাই। ওদের অনেকের অবস্থা এমন থাকে যে টাকার অভাবে ঈদে বাড়ি যেতে পারে না বা ঈদের দিন সামান্য চিনি / সেমায় কিনতে পারে না বা মা-বাবার ছেঁড়া কাপড়ের পরিবর্তে একটা নতুন শাড়ি / লুঙ্গি কিনে দিতে চায় – এই সামান্য টাকা ওদের অনেক উপকারে আসে। তাই, আপনি আপনার নিজ মোরাল চাইল্ড কে ঈদ গিফট দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্য ঈদ সালামী হিসাবে কিছু টাকা আমাদের কাছে দিতে পারেন। সকল মোরাল চাইল্ড আমাদের কাছে সমান, তাই সকলকে সাথে নিয়ে ঈদের আনন্দ করতে চাই। ঈদ সালামী আপনি যে কোন এমাউন্টে দিতে পারেন।
৬) ইমারজেন্সী ফান্ড-
মোরাল প্যারেন্টিং এ নিয়মিত বৃত্তির পরিমান খুব বেশি নয়; এই টাকা দিয়ে ওদের পুরা খরচ চলেনা। প্রায়ই মোরাল চিলড্রেনরা বিপদে পড়ে (ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, খাবার কেনা, মেস বিল, চিকিৎসা খরচ, বাস ভাড়া ইত্যাদি) আমাদের কাছে তাৎক্ষনিক সহায়তা চায়; আমরা সেটা তার মোরাল প্যারেন্ট কে ফরোয়ার্ড করি; কিন্তু অনেক মোরাল প্যারেন্ট অতিরিক্ত সহায়তা করতে পারেন না, বা সময় মত ইমেইল খেয়াল করেন না। তখন আমরা ইমারজেন্সী ফান্ড থেকে তাকে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করি। রমজান মাস উপলক্ষে এই ফান্ডে আপনি কিছু অনুদান / যাকাত /সাদাকা অনুদান দিতে পারেন- যা দিয়ে এরকম বিপদে-আপদে হেল্প করতে পারব!
by Administrator | Feb 19, 2026 | Success Story
গাইবান্ধা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম। নদীভাঙন আমাদের পরিবারকে শিখিয়েছে—এক মুহূর্তে সব হারানোর কষ্ট কাকে বলে। বাপ–দাদার ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হওয়ার পর আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম অন্য জায়গায়, যেখানে দারিদ্র্যই ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। বাবা কখনো গ্রামে ভ্যান চালাতেন, আবার কখনো ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাতেন। এই অস্থির জীবনে কোনো কিছুই স্থায়ী ছিল না—শুধু অভাব আর অনিশ্চয়তা।
সংসারের হাল ধরতে ছোট বয়সেই মাঠের কাজ, ভ্যান চালানো, টিউশনি—কী না করেছি! অভাব এতটাই তীব্র ছিল যে দুই-তিনবার বাড়ি ছেড়ে কাজের খোঁজে পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছি। আজ ফিরে তাকালে বুঝি, আল্লাহর রহমত না থাকলে হয়তো এই গল্প আর লেখা হতো না।
তবুও পড়াশোনার প্রতি আমার জেদ ছিল অদম্য। সব প্রতিকূলতার মাঝেই এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করি। এরপর ঢাকায় পড়তে আসা—যা ছিল স্বপ্ন ও সংগ্রামের মিশ্রণ। বাবা তখন ঢাকায় রিকশা চালান। রিকশা চালাতে চালাতে তিনি আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর বুয়েট এলাকা ঘুরিয়ে দেখাতেন। বলতেন,
“দেখ বাবা, একদিন তুই এখানেই পড়বি।”
রিকশার পেছনে বসে বাবার চোখে সেই স্বপ্ন দেখেছি—সেই স্বপ্নই আমার ভেতরে গেঁথে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। আর্থিক সংকটে পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যায়, গ্রামে ফিরে যেতে হয়। আবার নতুন করে লড়াই শুরু করি। বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও, সুযোগ আসে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদে। ভর্তির টাকাও তখন হাতে ছিল না—এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তায় সেই দরজা খুলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর গুলো ছিল চরম কষ্টের,থার্ড ইয়ারের শেষে খবর পাই মোরাল প্যারেন্টিং পরিবারের। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে এই পরিবার আমার পাশে দাঁড়ায় নির্ভরতার আশ্রয় হয়ে। মায়ানমার প্রবাসী এক মোরাল প্যারেন্টের ধারাবাহিক বৃত্তি ও মানসিক সাহস আমাকে পথে টিকে থাকার শক্তি দিয়েছে।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে—অসংখ্য ত্যাগ, দোয়া, উপবাস আর নিরলস পরিশ্রমের ফল হিসেবে ৪৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে পড়তে না পারলেও, বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে অন্যভাবে—আমি হয়েছি বিসিএস ক্যাডার।
নদীভাঙনে নিঃস্ব এক পরিবার, রিকশাচালক বাবার চোখে দেখা স্বপ্ন আর এক সংগ্রামী সন্তানের অদম্য বিশ্বাস—এই তিনে মিলেই আমার জীবনের গল্প।
মোঃ মানিক মিয়া
৪৪ তম বিসিএস লাইভস্টক ক্যাডার
সাবেক ছাত্র, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
by Administrator | Feb 19, 2026 | Success Story
আমার জীবনের ব্যাকরণ শুরু হয়েছিল এক জীর্ণ কুটিরে, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। বাবা ছিলেন দিনমজুর; কিন্তু তাঁর দুই চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। হাফেজ হওয়ার পর বাবা যখন বলতেন, “আল্লাহ চাইলে তুৃমি অনেক বড় অফিসার হতে পারবা,” তখন থেকেই সেই স্বপ্ন আমার ধমনীতে মিশে যায়।
২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছিল সেই স্বপ্নের প্রথম ধাপ। কিন্তু ২০২০ সালে করোনাকালে পুরো পৃথিবী যখন থমকে গেল, আমার পৃথিবীটাও ওলটপালট হয়ে গেল।আমার একমাত্র আশ্রয় ও শক্তির উৎস—বাবা না-ফেরার দেশে চলে গেলেন।আমার মায়ের চোখের পানি,একদিকে শোকের পাহাড়, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ; আমি তখন দিশেহারা।
সেই ঘোর অন্ধকারের দিনে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল ‘মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার’। তাঁরা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, পিতৃস্নেহে আমাকে নতুন করে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছেন। বিশেষ করে মাহবুব স্যার ও রওশন ম্যামের ভালোবাসা আমাকে শিখিয়েছে—স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে পর্বতের মতো অবিচল থাকতে হয়।
বাবার মৃত্যুর পর বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করা ছিল এক ভয়াবহ পরীক্ষা। টিউশনি আর অভাবের সাথে লড়াই করতে করতে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা চলত। ২০২২ সালে যখন ৪৫তম বিসিএস প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হলাম, আনন্দে দু’চোখ ভিজে উঠেছিল। কিন্তু রিটেন পরীক্ষার ঠিক আগে আমার সামনে হাজির হলো এক নিষ্ঠুর পরীক্ষা—একটি মিথ্যা মামলা। একদিকে আদালতের বারান্দা, অন্যদিকে জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা; অপমান আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম।আমার মা, বড়ভাই তারাও সাহস জুগিয়েছে।নিজেকে বুঝিয়েছি, আমার লড়াইটা শুধু আমার একার নয়, বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নের।
২০২২ সালের শেষে মামলা থেকে মুক্তি পেলেও রিটেন পরীক্ষার ঠিক আগে প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতায় ভেঙে পড়ি। প্রতিটি রাত কাটত তীব্র ব্যথা আর কান্নায়। কিন্তু কলম থামাইনি, কারণ আমি জানতাম—হাল ছেড়ে দেওয়া হবে বাবার স্বপ্নের সাথে বেইমানি।
অবশেষে আল্লাহ আমার শ্রমের প্রতিদান দিয়েছেন। আজ আমি ৪৫তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজন গর্বিত সদস্য। চারপাশে অভিনন্দনের জোয়ার,আমার পরিবার আত্বীয়-স্বজনরা সবাই অনেক খুশি কিন্তু ভিড়ের মাঝে কেবল সেই মানুষটিকেই খুঁজে ফিরি, যার জীর্ণ হাতে আমার আজকের এই সাফল্যের বীজ বোনা ছিল। বাবা নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আজ আমার পরিচয়ে বেঁচে আছে।আমি কৃতজ্ঞ মোরাল প্যারেন্টিং পরিবারের কাছে, যাঁরা আমার দুঃসময়ে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তাঁদের মাঝে আমি আজ আমার বাবার স্নেহ ও ভালোবাসা খুঁজে পাই। এখন আমার লক্ষ্য—আমিও যেন অন্যের স্বপ্ন পূরণে এভাবেই পাশে দাঁড়াতে পারি।
এইচ.এম. ফেরদাউস খান,
শিক্ষা ক্যাডার, ৪৫তম বিসিএস
সাবেক ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
by Administrator | Feb 19, 2026 | Success Story
গারো পাহাড়ের পাদদেশে, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার ঝুলগাঁও—দূর থেকে দেখলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। পাহাড়, বন আর কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই জনপদে জীবন মানে প্রতিদিনের লড়াই। দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী, শিক্ষার সুযোগ সীমিত, আর আধুনিক জীবনের স্বপ্ন যেন পাহাড়ের ওপারের গল্প। এই বাস্তবতার মধ্যেই আমার জন্ম—আমি সুমন আহমেদ রাহাত।
আমাদের এলাকায় ছেলেরা ছোটবেলা থেকেই গরু চরায়, পাহাড়ে কাঠ কাটে। পড়াশোনা এখানে বিলাসিতা। তবুও আমার জীবনে ব্যতিক্রমী আলো জ্বালিয়েছিলেন আমার বাবা। তিনি বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি, কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস করতেন—শিক্ষাই মানুষের ভাগ্য বদলায়। প্রায়ই বলতেন,
“তুই পড়াশোনা করিস বাবা, একদিন বড় মানুষ হবি।”
এই কথাই আমার জীবনের দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে।
খাড়া পাহাড়ি পথ, ঝড়-বৃষ্টি, কখনো খালি পেট—সব বাধা পেরিয়ে নিয়মিত স্কুলে যেতাম। বন্ধুরা যখন কাজে ব্যস্ত, আমি তখন বই নিয়ে বসে থাকতাম। ২০১৬ সালে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে এইচএসসিতে ভালো ফল করি। আমাদের গ্রামে আমিই প্রথম উচ্চ মাধ্যমিক পাস করি। কেউ উৎসাহ দিয়েছে, কেউ ঠাট্টা করেছে—কিন্তু বাবার বিশ্বাস আমাকে শক্ত রেখেছে।
এই লড়াইয়ের ফলেই আমি ভর্তি হই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। পাহাড় থেকে সমতলে এসে পড়াশোনা করা সহজ ছিল না—নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, অনিশ্চিত অর্থনীতি। বাবা কষ্ট করে আমার পড়াশোনার খরচ চালাতেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে নেমে আসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—বাবার ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসা, দৌড়ঝাঁপ, আর শেষ পর্যন্ত বাবার চলে যাওয়া—সবকিছু যেন মুহূর্তে ভেঙে দেয় আমাদের সংসার।
বাবাকে হারানোর পর ভিটেমাটি ও জমিজমা দখল হয়ে যায়। আমরা আশ্রয় নিই নানার বাড়িতে। সেই দিন থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয়ে ওঠে আরেক যুদ্ধ। টিউশনি করি, অল্প খাবারে দিন কাটাই, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িনি—কারণ জানতাম, হার মানা মানে বাবার স্বপ্নকে হারানো।
এই কঠিন সময়ে মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার আমার পাশে দাঁড়ায় বৃত্তি ও বিশ্বাস নিয়ে। সেই সহায়তা আমাকে আবার দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।
আজ পাহাড়ের পাদদেশে জন্ম নেওয়া এক ছেলের সবচেয়ে বড় সাফল্য—আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।
সুমন আহমেদ রাহাত
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
by Administrator | Feb 19, 2026 | Success Story
জীবন সবার জন্য সমান সুযোগ নিয়ে শুরু হয় না। কারো জীবন শুরু হয় আলোর ঝিলিক দিয়ে, আবার কারো জীবনে সেই আলো পৌঁছাতে হয় দীর্ঘ অন্ধকার আর পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে। আমার জীবনের শুরুটা ছিল সেই অন্ধকারের ভেতরেই—যেখানে স্বপ্ন দেখার আগে হিসাব করতে হতো পেটের ক্ষুধা আর আগামী দিনের অনিশ্চয়তার।
আমি একজন ভ্যানচালকের সন্তান। বাবার সেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর প্রতিদিনের সামান্য আয়ের ওপর ভর করেই চলত আমাদের টানাপোড়েনের সংসার। শৈশব থেকেই দেখেছি, নতুন জামার চেয়েও বই কেনা ছিল বিলাসিতার নামান্তর। অভাবের সাথে সেই মিতালি আমাকে অল্প বয়সেই শিখিয়ে দিয়েছিল—স্বপ্ন দেখতে হলেও তার চড়া মূল্য দিতে হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম, তখন খুশির চেয়েও ভয় আমাকে বেশি জাপ্টে ধরেছিল। গ্রাম থেকে এসে রাজধানীতে টিকে থাকার লড়াই, সেমিস্টার ফি আর থাকা-খাওয়ার চিন্তায় যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই আমার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে ‘মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার’। একদিন ফোনকলের ওপাশ থেকে ড. মাহবুব স্যার যখন বৃত্তির কথা জানালেন, মনে হলো অন্ধকার সমুদ্রে কেউ যেন বাতিঘরের সন্ধান দিল।
দীর্ঘ ছয়টি বছর এই সংগঠন শুধু আমায় আর্থিক সহায়তাই দেয়নি, দিয়েছে একটি বিশাল পরিবার। বিশেষ করে আমার মোরাল প্যারেন্ট আল তামিনী তপু স্যার, যিনি সুদূর প্রবাসে থেকেও ছায়ার মতো আমার পাশে ছিলেন। তাঁর সেই অনুপ্রেরণা আমাকে শুধু একজন বৃত্তিগ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। স্পোকেন ইংলিশ প্রোগ্রামের মেন্টর হওয়া থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়া—প্রতিটি পদক্ষেপে মোরাল প্যারেন্টিং আমাকে শিখিয়েছে নেতৃত্ব দিতে এবং মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সফলভাবে শেষ করেছি। একসময় যে অনিশ্চয়তা আমাকে তাড়া করত, আজ আমি সেই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছি। বর্তমানে আমি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত আছি। এখন আমার কর্মস্থলের সুবাদে যখন আমাদের কোনো মোরাল প্যারেন্টকে বিমানবন্দরে সেবা দেওয়ার সুযোগ পাই, তখন মনে হয় যেন নিজের পরম আত্মীয়র সেবা করছি। কৃতজ্ঞতার এই ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই।
সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, আমি এখন আর শুধু সাহায্যপ্রার্থী নই; আমি নিজেই একজন মোরাল প্যারেন্ট। অভাবের কারণে আমার যে পথ একদিন রুদ্ধ হতে চলেছিল, আজ অন্য কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবনে সেই পথের বাধা দূর করার দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে নিয়েছি।
কাদের মণ্ডল
গ্রাউন্ডিং ক্রু, BIMAN
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট, ঢাকা
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়