গাইবান্ধা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম। নদীভাঙন আমাদের পরিবারকে শিখিয়েছে—এক মুহূর্তে সব হারানোর কষ্ট কাকে বলে। বাপ–দাদার ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হওয়ার পর আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম অন্য জায়গায়, যেখানে দারিদ্র্যই ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। বাবা কখনো গ্রামে ভ্যান চালাতেন, আবার কখনো ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাতেন। এই অস্থির জীবনে কোনো কিছুই স্থায়ী ছিল না—শুধু অভাব আর অনিশ্চয়তা।
সংসারের হাল ধরতে ছোট বয়সেই মাঠের কাজ, ভ্যান চালানো, টিউশনি—কী না করেছি! অভাব এতটাই তীব্র ছিল যে দুই-তিনবার বাড়ি ছেড়ে কাজের খোঁজে পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছি। আজ ফিরে তাকালে বুঝি, আল্লাহর রহমত না থাকলে হয়তো এই গল্প আর লেখা হতো না।
তবুও পড়াশোনার প্রতি আমার জেদ ছিল অদম্য। সব প্রতিকূলতার মাঝেই এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করি। এরপর ঢাকায় পড়তে আসা—যা ছিল স্বপ্ন ও সংগ্রামের মিশ্রণ। বাবা তখন ঢাকায় রিকশা চালান। রিকশা চালাতে চালাতে তিনি আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর বুয়েট এলাকা ঘুরিয়ে দেখাতেন। বলতেন,
“দেখ বাবা, একদিন তুই এখানেই পড়বি।”
রিকশার পেছনে বসে বাবার চোখে সেই স্বপ্ন দেখেছি—সেই স্বপ্নই আমার ভেতরে গেঁথে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। আর্থিক সংকটে পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যায়, গ্রামে ফিরে যেতে হয়। আবার নতুন করে লড়াই শুরু করি। বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও, সুযোগ আসে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদে। ভর্তির টাকাও তখন হাতে ছিল না—এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তায় সেই দরজা খুলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর গুলো ছিল চরম কষ্টের,থার্ড ইয়ারের শেষে খবর পাই মোরাল প্যারেন্টিং পরিবারের। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে এই পরিবার আমার পাশে দাঁড়ায় নির্ভরতার আশ্রয় হয়ে। মায়ানমার প্রবাসী এক মোরাল প্যারেন্টের ধারাবাহিক বৃত্তি ও মানসিক সাহস আমাকে পথে টিকে থাকার শক্তি দিয়েছে।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে—অসংখ্য ত্যাগ, দোয়া, উপবাস আর নিরলস পরিশ্রমের ফল হিসেবে ৪৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে পড়তে না পারলেও, বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে অন্যভাবে—আমি হয়েছি বিসিএস ক্যাডার।
নদীভাঙনে নিঃস্ব এক পরিবার, রিকশাচালক বাবার চোখে দেখা স্বপ্ন আর এক সংগ্রামী সন্তানের অদম্য বিশ্বাস—এই তিনে মিলেই আমার জীবনের গল্প।
মোঃ মানিক মিয়া
৪৪ তম বিসিএস লাইভস্টক ক্যাডার
সাবেক ছাত্র, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।