আমার জীবনের ব্যাকরণ শুরু হয়েছিল এক জীর্ণ কুটিরে, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। বাবা ছিলেন দিনমজুর; কিন্তু তাঁর দুই চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। হাফেজ হওয়ার পর বাবা যখন বলতেন, “আল্লাহ চাইলে তুৃমি অনেক বড় অফিসার হতে পারবা,” তখন থেকেই সেই স্বপ্ন আমার ধমনীতে মিশে যায়।

২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছিল সেই স্বপ্নের প্রথম ধাপ। কিন্তু ২০২০ সালে করোনাকালে পুরো পৃথিবী যখন থমকে গেল, আমার পৃথিবীটাও ওলটপালট হয়ে গেল।আমার একমাত্র আশ্রয় ও শক্তির উৎস—বাবা না-ফেরার দেশে চলে গেলেন।আমার মায়ের চোখের পানি,একদিকে শোকের পাহাড়, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ; আমি তখন দিশেহারা।

সেই ঘোর অন্ধকারের দিনে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল ‘মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার’। তাঁরা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, পিতৃস্নেহে আমাকে নতুন করে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছেন। বিশেষ করে মাহবুব স্যার ও রওশন ম্যামের ভালোবাসা আমাকে শিখিয়েছে—স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে পর্বতের মতো অবিচল থাকতে হয়।

বাবার মৃত্যুর পর বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করা ছিল এক ভয়াবহ পরীক্ষা। টিউশনি আর অভাবের সাথে লড়াই করতে করতে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা চলত। ২০২২ সালে যখন ৪৫তম বিসিএস প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হলাম, আনন্দে দু’চোখ ভিজে উঠেছিল। কিন্তু রিটেন পরীক্ষার ঠিক আগে আমার সামনে হাজির হলো এক নিষ্ঠুর পরীক্ষা—একটি মিথ্যা মামলা। একদিকে আদালতের বারান্দা, অন্যদিকে জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা; অপমান আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম।আমার মা, বড়ভাই তারাও সাহস জুগিয়েছে।নিজেকে বুঝিয়েছি, আমার লড়াইটা শুধু আমার একার নয়, বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নের।

২০২২ সালের শেষে মামলা থেকে মুক্তি পেলেও রিটেন পরীক্ষার ঠিক আগে প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতায় ভেঙে পড়ি। প্রতিটি রাত কাটত তীব্র ব্যথা আর কান্নায়। কিন্তু কলম থামাইনি, কারণ আমি জানতাম—হাল ছেড়ে দেওয়া হবে বাবার স্বপ্নের সাথে বেইমানি।

অবশেষে আল্লাহ আমার শ্রমের প্রতিদান দিয়েছেন। আজ আমি ৪৫তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজন গর্বিত সদস্য। চারপাশে অভিনন্দনের জোয়ার,আমার পরিবার আত্বীয়-স্বজনরা সবাই অনেক খুশি কিন্তু ভিড়ের মাঝে কেবল সেই মানুষটিকেই খুঁজে ফিরি, যার জীর্ণ হাতে আমার আজকের এই সাফল্যের বীজ বোনা ছিল। বাবা নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আজ আমার পরিচয়ে বেঁচে আছে।আমি কৃতজ্ঞ মোরাল প্যারেন্টিং পরিবারের কাছে, যাঁরা আমার দুঃসময়ে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তাঁদের মাঝে আমি আজ আমার বাবার স্নেহ ও ভালোবাসা খুঁজে পাই। এখন আমার লক্ষ্য—আমিও যেন অন্যের স্বপ্ন পূরণে এভাবেই পাশে দাঁড়াতে পারি।

এইচ.এম. ফেরদাউস খান,

শিক্ষা ক্যাডার, ৪৫তম বিসিএস

সাবেক ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।