আমার জীবনের ব্যাকরণ শুরু হয়েছিল গণিতের কঠিন সমীকরণ দিয়ে নয়, বরং অভাবের নিষ্ঠুর হিসাব দিয়ে। আজ আমি ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) গণিত বিভাগের প্রভাষক; কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে ধানের চাতাল, চায়ের দোকান আর মাটি কাটার এক দীর্ঘ ইতিহাস লুকানো আছে।
আমি মোজাম্মেল। আমার বড় হওয়া এক প্রত্যন্ত গ্রামের দিনমজুর পরিবারে। বাবার সামান্য আয়ে যখন দু’বেলা খাবার জোটানোই ছিল অসম্ভব, তখন পড়াশোনা ছিল আমাদের জন্য আকাশের চাঁদ ছোঁয়ার মতো এক বিলাসিতা। শৈশবেই বুঝেছিলাম, টিকে থাকতে হলে হাতের তালুর চামড়া আর মনের জেদ—দুই-ই শক্ত হতে হয়। বইয়ের পাতা ওল্টানোর আগে আমাকে ধানের চাতালে শ্রম দিতে হয়েছে, চায়ের দোকানে কাপ ধুতে হয়েছে, এমনকি নিজের পড়ার খরচ জোগাতে আমি কোদাল হাতে মাটিও কেটেছি।
অন্ধকার ঘরে এক চিলতে প্রদীপ জ্বালাবার মতোই ছিল আমার জেদ। কোনো নামি কোচিং বা গৃহশিক্ষক ছাড়াই কেবল আত্মবিশ্বাসের জোরে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করি। এরপর স্বপ্নের হাতছানি ছিল ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল সাবজেক্ট পাওয়ার পরেও শুধুমাত্র টিউশনির সহজ লভ্যতার চিন্তা করে আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হই। আমি টিউশনি করে নিজে চলেছি; পরে আমার ছোট বোনকেও এই ভার্সিটিতেই পড়িয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল আমার জন্য আরও এক অগ্নিপরীক্ষা। নিজের মেস ভাড়া, সেমিস্টার ফি আর বাড়িতে টাকা পাঠানোর চাপে যখন আমার স্বপ্নগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম, ঠিক তখনই আমার জীবনে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো আশীর্বাদ হয়ে আসে ‘মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার’।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক উদার শিক্ষক দম্পতি আমার ‘মোরাল প্যারেন্ট’ হিসেবে পাশে দাঁড়ালেন। জীবনের সেই চরম দুর্দিনে তাঁরা কেবল আর্থিক সহায়তাই দেননি, দিয়েছিলেন একজন সত্যিকারের অভিভাবকের মমতা। সেই নিশ্চিন্ত আশ্রয় আমাকে সুযোগ করে দিয়েছিল নিজের পুরোটা মেধা ঢেলে দেওয়ার। ফলাফল হিসেবে স্নাতক পরীক্ষায় ৪৫তম ব্যাচে ২য় স্থান এবং স্নাতকোত্তরে পুরো বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করি। এমনকি ১০ম ও ১১শ জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে (ঢাকা উত্তর রিজিয়ন) যথাক্রমে তৃতীয় ও প্রথম স্থান অধিকার করেছি।
আজ আমি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাই। কিন্তু সেই পথচলায় আমার মোরাল প্যারেন্টদের ঋণ আমি কোনোদিন ভুলব না। তাঁরা যদি সেদিন আমার হাত না ধরতেন, তবে হয়তো কোনো মাটির কাছে বা ধানের চাতালেই হারিয়ে যেত আমার সব মেধা।
মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি আমার মতো অসংখ্য ‘মোজাম্মেল’দের পুনরায় জন্ম দেওয়ার কারখানা। আপনার একটুখানি সহমর্মিতা হয়তো আরও একটি পরিবারের অন্ধকার দূর করে শিক্ষার মশাল জ্বালাতে পারে। আসুন, মেধাবী এই প্রাণগুলোর পাশে দাঁড়াই, ওদের স্বপ্নকেবাস্তবে রূপ দিই।
মো: মোজাম্মেল হক প্রভাষক, গণিত বিভাগ
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)
সাবেক ছাত্র, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।