জীবন সবার জন্য সমান সুযোগ নিয়ে শুরু হয় না। কারো জীবন শুরু হয় আলোর ঝিলিক দিয়ে, আবার কারো জীবনে সেই আলো পৌঁছাতে হয় দীর্ঘ অন্ধকার আর পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে। আমার জীবনের শুরুটা ছিল সেই অন্ধকারের ভেতরেই—যেখানে স্বপ্ন দেখার আগে হিসাব করতে হতো পেটের ক্ষুধা আর আগামী দিনের অনিশ্চয়তার।
আমি একজন ভ্যানচালকের সন্তান। বাবার সেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর প্রতিদিনের সামান্য আয়ের ওপর ভর করেই চলত আমাদের টানাপোড়েনের সংসার। শৈশব থেকেই দেখেছি, নতুন জামার চেয়েও বই কেনা ছিল বিলাসিতার নামান্তর। অভাবের সাথে সেই মিতালি আমাকে অল্প বয়সেই শিখিয়ে দিয়েছিল—স্বপ্ন দেখতে হলেও তার চড়া মূল্য দিতে হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম, তখন খুশির চেয়েও ভয় আমাকে বেশি জাপ্টে ধরেছিল। গ্রাম থেকে এসে রাজধানীতে টিকে থাকার লড়াই, সেমিস্টার ফি আর থাকা-খাওয়ার চিন্তায় যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই আমার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে ‘মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার’। একদিন ফোনকলের ওপাশ থেকে ড. মাহবুব স্যার যখন বৃত্তির কথা জানালেন, মনে হলো অন্ধকার সমুদ্রে কেউ যেন বাতিঘরের সন্ধান দিল।
দীর্ঘ ছয়টি বছর এই সংগঠন শুধু আমায় আর্থিক সহায়তাই দেয়নি, দিয়েছে একটি বিশাল পরিবার। বিশেষ করে আমার মোরাল প্যারেন্ট আল তামিনী তপু স্যার, যিনি সুদূর প্রবাসে থেকেও ছায়ার মতো আমার পাশে ছিলেন। তাঁর সেই অনুপ্রেরণা আমাকে শুধু একজন বৃত্তিগ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। স্পোকেন ইংলিশ প্রোগ্রামের মেন্টর হওয়া থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়া—প্রতিটি পদক্ষেপে মোরাল প্যারেন্টিং আমাকে শিখিয়েছে নেতৃত্ব দিতে এবং মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সফলভাবে শেষ করেছি। একসময় যে অনিশ্চয়তা আমাকে তাড়া করত, আজ আমি সেই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছি। বর্তমানে আমি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত আছি। এখন আমার কর্মস্থলের সুবাদে যখন আমাদের কোনো মোরাল প্যারেন্টকে বিমানবন্দরে সেবা দেওয়ার সুযোগ পাই, তখন মনে হয় যেন নিজের পরম আত্মীয়র সেবা করছি। কৃতজ্ঞতার এই ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই।
সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, আমি এখন আর শুধু সাহায্যপ্রার্থী নই; আমি নিজেই একজন মোরাল প্যারেন্ট। অভাবের কারণে আমার যে পথ একদিন রুদ্ধ হতে চলেছিল, আজ অন্য কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবনে সেই পথের বাধা দূর করার দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে নিয়েছি।
কাদের মণ্ডল
গ্রাউন্ডিং ক্রু, BIMAN
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট, ঢাকা
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়