গারো পাহাড়ের পাদদেশে, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার ঝুলগাঁও—দূর থেকে দেখলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। পাহাড়, বন আর কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই জনপদে জীবন মানে প্রতিদিনের লড়াই। দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী, শিক্ষার সুযোগ সীমিত, আর আধুনিক জীবনের স্বপ্ন যেন পাহাড়ের ওপারের গল্প। এই বাস্তবতার মধ্যেই আমার জন্ম—আমি সুমন আহমেদ রাহাত।
আমাদের এলাকায় ছেলেরা ছোটবেলা থেকেই গরু চরায়, পাহাড়ে কাঠ কাটে। পড়াশোনা এখানে বিলাসিতা। তবুও আমার জীবনে ব্যতিক্রমী আলো জ্বালিয়েছিলেন আমার বাবা। তিনি বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি, কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস করতেন—শিক্ষাই মানুষের ভাগ্য বদলায়। প্রায়ই বলতেন,
“তুই পড়াশোনা করিস বাবা, একদিন বড় মানুষ হবি।”
এই কথাই আমার জীবনের দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে।
খাড়া পাহাড়ি পথ, ঝড়-বৃষ্টি, কখনো খালি পেট—সব বাধা পেরিয়ে নিয়মিত স্কুলে যেতাম। বন্ধুরা যখন কাজে ব্যস্ত, আমি তখন বই নিয়ে বসে থাকতাম। ২০১৬ সালে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে এইচএসসিতে ভালো ফল করি। আমাদের গ্রামে আমিই প্রথম উচ্চ মাধ্যমিক পাস করি। কেউ উৎসাহ দিয়েছে, কেউ ঠাট্টা করেছে—কিন্তু বাবার বিশ্বাস আমাকে শক্ত রেখেছে।
এই লড়াইয়ের ফলেই আমি ভর্তি হই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। পাহাড় থেকে সমতলে এসে পড়াশোনা করা সহজ ছিল না—নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, অনিশ্চিত অর্থনীতি। বাবা কষ্ট করে আমার পড়াশোনার খরচ চালাতেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে নেমে আসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—বাবার ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসা, দৌড়ঝাঁপ, আর শেষ পর্যন্ত বাবার চলে যাওয়া—সবকিছু যেন মুহূর্তে ভেঙে দেয় আমাদের সংসার।
বাবাকে হারানোর পর ভিটেমাটি ও জমিজমা দখল হয়ে যায়। আমরা আশ্রয় নিই নানার বাড়িতে। সেই দিন থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয়ে ওঠে আরেক যুদ্ধ। টিউশনি করি, অল্প খাবারে দিন কাটাই, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িনি—কারণ জানতাম, হার মানা মানে বাবার স্বপ্নকে হারানো।
এই কঠিন সময়ে মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার আমার পাশে দাঁড়ায় বৃত্তি ও বিশ্বাস নিয়ে। সেই সহায়তা আমাকে আবার দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।
আজ পাহাড়ের পাদদেশে জন্ম নেওয়া এক ছেলের সবচেয়ে বড় সাফল্য—আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।
সুমন আহমেদ রাহাত
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়